Don't Miss
হোম / অর্থনীতি / ডলারের পর এখন টাকার টানাটানি

ডলারের পর এখন টাকার টানাটানি

ডলারের পর এখন টাকার টানাটানি

প্রতি ডলার ৭৯ টাকা হিসাবে বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। এখন বাজার থেকে ৮৩ টাকার বেশি দরে ডলার কিনে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার আমদানি ব্যাপক হারে বাড়লেও রফতানি ও রেমিট্যান্স সেই হারে বাড়ছে না। এতে করে ডলার সংকট রয়েছে মুদ্রাবাজারে। ডলার সংকট মেটাতে গিয়ে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ১২০ কোটি ডলার বিক্রি করে বাজার থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার ব্যাংক খাতে আমানতের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়ে গেছে। এসব কারণে ডলারের পাশাপাশি টাকার টানাটানিতে পড়েছে অনেক ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী সমকালকে বলেন, আমদানির সঙ্গে রফতানি ও রেমিট্যান্স সমান হারে না বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ডলার বিক্রির কারণে বাজার থেকে টাকা উঠে এলেও বিক্রি না করে উপায় নেই। কেননা ডলারের অভাবে কোনো বিদেশি ঋণ পরিশোধ আটকে গেলে দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, বিদেশি ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের আমদানি, খাদ্য আমদানি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এ কারণে অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমাতে ব্যাংকগুলোকে ইতিমধ্যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, ছয় মাস আগেও বেশিরভাগ ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল। এখন উল্টো চিত্র দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে গত নভেম্বরে বার্ষিক আমানত বেড়েছে ১১ শতাংশ। বিপরীতে ঋণ বেড়েছে ১৯ শতাংশের বেশি। ঋণ প্রবৃদ্ধির এ হার গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কয়েকটি ব্যাংকের আমানতের তুলনায় ঋণ দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। কিছু ব্যাংক ডলার সংস্থান না করেই এলসি খুলেছে। অনেক ব্যাংক অফশোর ইউনিট থেকে এমন কিছু গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে, যাদের কোনো বৈদেশিক মুদ্রা আয় নেই। কিছু ব্যাংক সুদহার বাড়ালেও আমানত তেমন বাড়াতে পারছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ অবস্থার জন্য অনেক ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাকে দায়ী করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, অন্তত ১৫টি ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) নির্ধারিত সীমার ওপরে উঠেছে। এর মানে এসব ব্যাংক মোট আমানতের নির্ধারিত সীমার বেশি ঋণ দিয়ে ফেলেছে। এ কারণে কয়েকটি ব্যাংককে সতর্কও করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমে ৯২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় নেমেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা এক লাখ ২৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা ছিল। গত কয়েক বছরের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় উদ্বৃত্ত তারল্য কখনও এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার নিচে আসতে দেখা যায়নি। অবশ্য উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই অলস অর্থ নয়। এ অর্থের অধিকাংশই সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা। তবে এ থেকে তারল্যের একটি চিত্র পাওয়া যায়।

জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি আমানত না পেয়ে অনেক ব্যাংক এখন কলমানিসহ স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন উপাদান থেকে তহবিল নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘হোলসেল বরোয়িং’ তথা স্বল্পমেয়াদি তহবিল এবং ‘কমিটমেন্ট’ বা নন-ফান্ডেড দায়ের ওপর কঠোর তদারকি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো একশ’ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো ৯০ টাকা ঋণ দিতে পারে। তা কমিয়ে ৮০ টাকা ৫০ পয়সা এবং ৮৮ টাকা করা হতে পারে। নতুন মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে ঘোষণা থাকতে পারে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ রয়েছে। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। আবার পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য প্রচুর এলসি খুলতে গিয়ে আমদানিতে ৩০ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ রফতানি বেড়েছে ৭ শতাংশের মতো। আর রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হলেও দুই বছর আগের সঙ্গে তুলনা করলে তা কম। এসব কারণে মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।

গত অর্থবছরে এবং তার আগেও ডলারের সরবরাহ বেশি থাকায় প্রচুর ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিদেশি ঋণ পরিশোধ এবং আমদানি ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ১২০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে বাজার থেকে উঠে এসেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছর ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগের অর্থবছর ৪১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনলেও এক ডলারও বিক্রির প্রয়োজন পড়েনি। তার আগের অর্থবছর ৩৭৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার কিনে বিক্রি করে মাত্র ৩৫ কোটি ৭০ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর বাজার থেকে ৫১৫ কোটি ডলার কিনলেও কোনো ডলার বিক্রি করেনি। ফলে গত কয়েক বছর ধরে অধিকাংশ ব্যাংকের কাছে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত নভেম্বর পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৮২ কোটি ডলার। এসব ঋণের বিপরীতে গত নভেম্বরে ১৩৩ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের মাস অক্টোবরে পরিশোধ করা হয় ১০৫ কোটি ডলার। এ ছাড়া ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ৫৮ কোটি ডলার সমপরিমাণের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে এসব মেয়াদি ঋণের বিপরীতে পরিশোধ হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ০৬ শতাংশের বেশি। এতে করে এক সময় হুহু করে বাড়তে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। ২০০৯ সালে রিজার্ভ ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার থেকে গত বছরের ২২ জুন ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। এর মধ্যে ২০১৬ সালে চার বিলিয়ন ডলার বেড়েছিল। তবে সম্প্রতি তা ৩২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ডলার সংকটের কারণে গত এক বছরে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের দর ৪ টাকা ৪ পয়সা থেকে বেড়ে ৮২ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে।

উত্তর দিন

মন্তব্য করুন!

  Subscribe  
এর রিপোর্ট করুন