Don't Miss
হোম / রাজনীতি / রাজনীতিতে হিউমার এবং প্রধানমন্ত্রীর গাধা-উপাখ্যান

রাজনীতিতে হিউমার এবং প্রধানমন্ত্রীর গাধা-উপাখ্যান

রাজনীতিতে হিউমার এবং প্রধানমন্ত্রীর গাধা-উপাখ্যান

কথাটা রবীন্দ্রনাথের না অন্য কোনো পণ্ডিত ব্যক্তির, তা আমার মনে পড়ছে না। কথাটা হলো, ‘মানুষ ও পশু সমাজের মধ্যে বড় পার্থক্য এই যে, পশু সমাজে হিউমার নেই।’  আমি এটাকে রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সত্য মনে করি। যে রাজনৈতিক নেতার মধ্যে যত বেশি হিউমার থাকে, তিনি তত বড় নেতা হন, তত জনপ্রিয় হন। বিশ্বে যারা বড় এবং সফল রাজনৈতিক নেতা হয়েছেন, তাদের অধিকাংশের মধ্যে হিউমারের ছড়াছড়ি ছিল। প্রতিবেশীকে গালিগালাজ করে নয়, সরস বাক্য বলে তারা কাবু করতেন।
চার্চিল, রুজভেল্ট থেকে এশিয়ার নেহেরু, ফজলুল হক, ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত সকল নেতাই ছিলেন হিউমার দিয়ে কথা বলায় পারদর্শী। ফজলুল হকের সকল বক্তৃতাই তো ছিল সরস গালগল্প। মানুষকে তিনি হাসাতে পারতেন, আবার কাঁদাতেও পারতেন। চার্চিলকে একবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তার বিরোধী পক্ষের এক মহিলা বলেছিলেন, ‘আপনি এতোই বিরক্তিকর একজন মানুষ যে, আপনি আমার স্বামী হলে আপনার চায়ের কাপে বিষ মিশিয়ে আপনাকে মেরে ফেলতাম।’ সকলেই ভাবলেন, চার্চিল একটা শক্ত জবাব দেবেন। কিন্তু না, দেখা গেল চার্চিল হাসিমুখে বলেছেন, ‘ম্যাডাম, আপনি আমার স্ত্রী হলে সেই চা আমি সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে মরে যেতাম। কারণ, তাহলে সহজে আপনার হাত থেকে মুক্তি পেতাম।’
পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় গণপরিষদে দাঁড়িয়ে শাসক মুসলিম লীগ দলের নেতারা ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, ফজলুল হক ভারতের দালাল। তিনি যদি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন, তাহলে দেশটাকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দেবেন। এই উক্তিতে হক সাহেব রাগ করেননি। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বরিশালের গ্রাম্যবাংলায় যে কথা বলেছিলেন, তার শুদ্ধ বাংলা হলো, ‘চোরার পুত্র চোরেরা, তোমরা দেশটাকে লুটপাট করে কিছু রেখেছ যে, বিক্রি করে দুটা পয়সা পাব?’
এই ধরনের হিউমারমিশ্রিত বক্তব্য দানের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বিখ্যাত। তাদের কথা আজ আমার লেখায় এজন্যই টানলাম যে, বঙ্গবন্ধু-কন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যও অনেক সময় নিরস রাজনৈতিক কথা নয়, হয়ে ওঠে সরস কৌতুকপূর্ণ। এই কৌতুক বা হিউমারে কোনো অশালীনতা থাকে না। যেমন জিন্না ঠাট্টা করে নেহেরুকে বলতেন, পিটার প্যান। নেহেরুর পক্ষ থেকে জিন্নাকে বলা হতো, হাফ এডুকেটেড ব্যারিস্টার, কারণ জিন্না উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না। ম্যাট্রিক পাস করেই বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েছিলেন। তখন সেটাই নিয়ম ছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে হিউমারের অভাব লক্ষণীয়, রাজনীতির মান যেমন নেমেছে, তেমনি নেমেছে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের মানও। অধিকাংশ সময় তা থাকে প্রতিপক্ষের প্রতি কুরুচিপূর্ণ গালাগালিতে ভর্তি। এদিক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরস ও শোভন কথাবার্তার পুরনো ঐতিহ্য এখনো বজায় রেখেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বলা চলে বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদও। তার বক্তৃতায় কিশোরগঞ্জের ভাষায় যে হিউমার থাকে, তা মানুষকে যেমন হাসায়, তেমনি ভাবায়।
এবার আসল কথায় আসি। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে সিপিডি’র একটি পর্যালোচনা (২০১৭-১৮) সম্পর্কে সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে গাধা-উপাখ্যান বলেছেন, তাতে আমি প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সমালোচক বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতজনকে আবার গাধা বলেছেন কি না। সংবাদপত্রে তার বক্তৃতার পূর্ণ বিবরণ পাঠ করতেই ভয়টা কাটল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘আমি কাউকে গাধা বলছি না। তারা (সমালোচক বুদ্ধিজীবীরা) জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত, বিদেশ থেকে উচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। তবে তাদের আচরণগুলো যখন দেখি, তখন গাধার কথা মনে হয়, সার্কাসের গাধা সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করার লোভ করে সেই মেয়ে কখন দড়ি ছিঁড়ে পড়বে সে আশায় বসে থাকে’।
প্রধানমন্ত্রীর কথার নির্গলিতার্থ হলো, তারা (একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা) কবে দেশে সামরিক বা স্বৈরাচারী শাসন আসবে তার অপেক্ষা করে। গণবিরোধী এই শাসন এলেই তাদের ক্ষমতার ভাগ নেওয়ার আশা পূর্ণ হয়। সুযোগ-সুবিধা বাড়ে। জনগণের ভোটে তারা কখনো ক্ষমতায় যেতে পারে না। তাই ডাস্টবিনের মতো তারা গায়ে ‘ইউজ মি’ লিখে অপেক্ষা করেন এবং গণবিরোধী সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের দ্বারা ব্যবহূত হন।
আমাদের দেশের একটি সুশীল সমাজ ও একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য কঠোর, কিন্তু হিউমার পূর্ণ। তিনি শালীনতার গণ্ডির মধ্যেই তাদের সমালোচনা করেছেন।
সিপিডির যে অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সম্পর্কে তিনি এই মন্তব্য করেছেন, সেটিকে একদেশদর্শী এবং কিছুটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হয়। তারা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিস্ময়কর গতিশীলতার স্বীকৃতির চাইতেও ধনী-গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছেন, ২০১৭ সালকে তারা ব্যাংকখাতের কেলেঙ্কারির বছর বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই পর্যালোচনাকে এক দেশদর্শী বলেছি এজন্যই যে, অতীতের অন্যান্য সরকারের তুলনায় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিকে সিপিডির এই পর্যালোচনায় গুরুত্ব না দিয়ে ধনী গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধি ও ব্যাংক কেলেঙ্কারিকে একটি নির্বাচনী বছরে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে এই গণতান্ত্রিক সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
অন্যদিকে এই গবেষক পণ্ডিতদের বা তথাকথিত সুশীল সমাজের আওয়ামী লীগ বিদ্বেষের কথাও সবাই জানেন, সুতরাং দেশের নির্বাচনী বছরে এই ধরনের একটি পর্যালোচনা প্রকাশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মনে হতেই পারে। প্রথম কথা, আমরা যদি অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ অনুসরণ করি, তাহলে কোনো দেশের যতই উন্নয়ন ঘটুক সেখানে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়বেই। এটা ব্রিটেনে ঘটেছে, এমনকি চীনের কম্যুনিষ্ট সরকারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। চীনের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে জানা যায়, চীন এখন বিশ্বের সেরা অর্থনৈতিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও দেশটিতে গরিবের সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও পুঁজিবাদী উন্নয়ন, বঙ্গবন্ধুর সমাজবাদী উন্নয়নের ধারা বহুকাল আগে পরিত্যক্ত হয়েছে। এখন কাঁঠাল গাছে আম ফলাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। তবে বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নের ধারার একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়লেও আগের সেই সর্বহারা গরিব শ্রেণিটি আর নেই। একজন রিকশাওয়ালার আয় এখন একজন চাকরিজীবী সাধারণ মধ্যবিত্তের চাইতে অনেক বেশি। তাদের আয় অবশ্যই নব্য ধনীদের তুলনায় কিছুই নয়। অর্থাত্ নব্য ধনীদের বিত্তবৃদ্ধির সঙ্গে গরিবের আয় বৃদ্ধির তুলনা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে অনাহারী, অভাবী গরিবের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বরং তারা সচ্ছল আয়ের একটা শ্রেণিতে উন্নত হয়েছে। গ্রামের বেলাতেও এটা সত্য।
হাসিনা সরকারের একটা বড় সাফল্য বাংলাদেশে অনাহারী গরিব ও কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর এখন আর নেই। গরিবী হটাও আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু বাংলাদেশে সেই আন্দোলনের সাফল্য দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই দিকটার প্রতি আলোকপাত না করে নব্য ধনী ও সদ্য দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা মানুষের আয়ের তুলনা দেখিয়ে সিপিডি দেশের মানুষের সামনে দেশের অর্থনীতির যে চেহারা তুলে ধরতে চেয়েছেন তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।
২০১৭ সালকে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর আখ্যা দেওয়াও একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অংশ বলে মনে হয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যাংক কেলেঙ্কারি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিকাশে এই কেলেঙ্কারি বার বার ঘটছে ব্রিটেনসহ ইউরোপ ও আমেরিকায়। কয়েক বছর আগে এটা ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছিল ইউরোপ ও আমেরিকায়। তথাকথিত ফ্রি মার্কেট অর্থনীতিকে তখন সমাজতান্ত্রিক প্রেসক্রিপশন মেনে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ঘটাতে হয়েছিল।
বাংলাদেশেও নব্য ধনীদের লুটপাট এবং ব্যাংক কেলেঙ্কারি কোনো নতুন ঘটনা নয়। অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব বিশ্বব্যাংকের ‘সাগরেদ’ না হয়ে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে একটু সমাজতান্ত্রিক রক্ষণশীলতা গ্রহণ করলে ভালো করতেন। সিপিডি সমস্যার এদিকটাতে নজর না দিয়ে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছে। আমাদের সুশীল সমাজ অর্থনীতির পুঁজিবাদী বিকাশে উত্সাহী। কিন্তু তার স্খলন ও পতনের জন্য সরকারকে দায়ী করতে চান। তারা এই সত্যটাকে জেনেও অস্বীকার করার ভান করেন যে, এই সরকার অর্থনীতির পুঁজিবাদী বিকাশের ধারা অনুসরণ করতে বাধ্য হলেও কিছুটা “কর্তৃত্ববাদী” মনোভাব গ্রহণ করে গরিবী হটাও অভিযানে অনেকটাই সফল হয়েছেন। ধনী-গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধি দ্বারা এই সাফল্যকে আড়াল করা যায় না। যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে আড়াল করতে চান, হাসিনার শোভন রসিকতা তাদের মর্মমূলে বিঁধবে।

উত্তর দিন

মন্তব্য করুন!

  Subscribe  
এর রিপোর্ট করুন