Don't Miss
হোম / রাজনীতি / খুলনা সিটিতে নৌকার জয়

খুলনা সিটিতে নৌকার জয়

 

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) নগরপিতার আসনে ফের বসছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক। তিনি ৬৭ হাজার ৯৪৬ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে পরাজিত করেন। নৌকা প্রতীক নিয়ে খালেক ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট পেয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মঞ্জু ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট পেয়েছেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত ২৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ২৮৬টির (তিনটি স্থগিত) ফলাফলের ভিত্তিতে যুগান্তরের খুলনা ব্যুরো অফিস এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে ২০০৮ সালে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তালুকদার আবদুল খালেক।

এদিকে মঙ্গলবার রাত ২টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী মেয়র পদে ১৬৩টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করেন। তখন পর্যন্ত তালুকদার আবদুল খালেক ৯৪ হাজার ৩৫২ ভোট, নজরুল ইসলাম মঞ্জু ৫৯ হাজার ৪৫৮ ভোট পেয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মো. মোজাম্মেল হক (হাতপাখা) পেয়েছেন ৭ হাজার ৭৯০ ভোট, জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) এসএম সফিকুর রহমান মুসফিক ৬০৮ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবির মেয়র প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু (কাস্তে) পেয়েছেন ৩২৮ ভোট। খুলনা সিটি নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন।

জয়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, ‘প্রশাসনের ভোটে নয়, জনগণের ভোটে আমি মেয়র নির্বাচিত হয়েছি।’ ভোট দেয়ায় জনগণের কাছে ঋণী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘খুলনার জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমি তাদের কাছে ঋণী। আমি এ ঋণ শোধ করব কাজের মাধ্যমে।’ অক্লান্ত পরিশ্রম করায় নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান নৌকা প্রতীকের এ প্রার্থী।

পরাজিত প্রার্থীকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবেন কিনা- এমন প্রশ্নে তালুকদার খালেক বলেন, ‘অবশ্যই। আমি যখন খুলনার মেয়র ছিলাম, তখন তিনি (নজরুল ইসলাম মঞ্জু) এমপি ছিলেন। সে আমার আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আমরা যখন খুলনা শহরে বিভিন্ন আন্দোলনে মাঠে ছিলাম, সেও সেই আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল। মাঠপর্যায়ের একজন নেতা তিনি, এটা আমি অস্বীকার করি না। নির্বাচনে একজন হারবে একজন জিতবে। সবকিছু মেনে নিয়েই আমাদের চলতে হবে।’

খুলনা শহরের উন্নয়নে মঞ্জুর যে কোনো ধরনের সহযোগিতা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘খুলনা শহর আমাদের। আমরা সবাই বসবাস করি। এ শহরটা যদি ভালো থাকে আমরা ভালো থাকব। আমি চেষ্টা করব, যেসব অঙ্গীকার করেছি সেগুলো বাস্তবায়ন করার।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তালুকদার খালেক বলেন, ‘আমি পাঁচ বছর যে কাজগুলো রেখে গিয়েছিলাম, সেই অর্থ এবং কাজ কীভাবে কার্যক্রম হইছে, সেটা আমি যাচাই-বাছাই করব। এটা আমি তদন্ত করে দেখব, এর সঙ্গে যদি কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকে সেটাও তদন্তে বের হয়ে যাবে। পাশাপাশি এই কাজগুলো দিয়েই আবার শুরু করব।’

নির্বাচনে ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার খালেক বলেন, ‘সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আমি বিভিন্ন কেন্দ্রে গেছি। উনি কোন কেন্দ্রে গেছেন, আমি জানি না। আমার সঙ্গে অনেক সাংবাদিক ছিল। কোনো কেন্দ্রে আমার চোখের সামনে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এটা একটা সাজানো নাটক।’

অপরদিকে পরাজয়ের পর বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘ভোট ডাকাতির মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।’ যুগান্তরকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘গত এক মাস ধরে এ ভোট ডাকাতির প্লাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। গণ-গ্রেফতার, আক্রমণ, আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং আজকের (মঙ্গলবার) কেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সারা শহরে বহিরাগতদের দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে ভোট ডাকাতি হয়েছে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ভোটারদের ভয় দেখিয়ে কেন্দ্রে যেতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া, শহরে অস্ত্রের প্রদর্শন, পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার মধ্য দিয়ে ভোট ডাকাতি হয়েছে কেন্দ্রে কেন্দ্রে। ভোট ডাকাতি হওয়া শতাধিক কেন্দ্র বাতিলের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে ভোট গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এ ভোট ডাকাতির মধ্য দিয়ে নগরবাসীর ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। কেসিসি নির্বাচনে সরকারের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। ভোট ডাকাতির এ মহোৎসবের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

বিএনপির এ মেয়র প্রার্থী আরও বলেন, সারা দিনে তিনি বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে ভোট ডাকাতির চিত্র দেখেছেন। প্রশাসন ও ইসির সহযোগিতায় এ ভোট ডাকাতি হয়েছে। ধানের শীষের এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বুথ থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। জনগণ এ নির্বাচন দেখেছে। সাংবাদিকরাও সরেজমিন ভোট ডাকাতির চিত্র পরিদর্শন করেছেন। ভোটের ফলাফল মেনে নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণের রায়কে তিনি মেনে নিতেন। জনগণের রায়কে ভয় পেয়ে আওয়ামী লীগ কেসিসিতে ভোট ডাকাতি করেছে।

এদিকে নৌকার জয়ের খবরে খুলনায় আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নগরীর বিভিন্ন অলিগলি ও সড়কে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়। অপরদিকে নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপিতে নীরবতা নেমে এসেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খুলনা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ জয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, উন্নয়নের আশা জাগিয়ে তালুকদার আবদুল খালেক নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। এবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে খুলনাবাসীর উন্নয়নে তিনি সব পদক্ষেপ নেবেন- এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। আগামী সেপ্টেম্বরে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ শেষ হবে। এরপরই নগরপিতার চেয়ারে বসবেন তালুকদার আবদুল খালেক।

এর আগে সর্বশেষ ২০১৩ সালে খুলনা সিটি নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মনিরুজ্জামান মনির কাছে ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক। যদিও ওই নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়নি। এবার দলীয় প্রতীক নিয়ে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে হারিয়ে মেয়র হলেন তিনি।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর স্থানীয়রা জানান, তালুকদার খালেক চারবারের এমপি, একবারের প্রতিমন্ত্রী, এক মেয়াদে কেসিসির মেয়র ছিলেন। তিনি বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্যপদ ছেড়ে খুলনার মেয়র নির্বাচন করেন। তার পক্ষে এবার পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারেও অনেকে প্রচারণায় নামেন, যা ভোটারদের মধ্যে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের দাবি- ২০০৮-১৩ মেয়াদে তালুকদার আবদুল খালেকের পাঁচ বছরে শহরের রাস্তাঘাটের যেমন উন্নয়ন হয়েছিল, তেমনি নগরীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতাও দূর হয়েছিল। খালগুলো অবৈধ দখলদারমুক্ত হয়েছিল। কিন্তু বিএনপির মনিরুজ্জামান মনির গত পাঁচ বছরে সেই তুলনায় উন্নয়ন করতে পারেননি। খালগুলো আবারও দখলদারদের কবলে। নগর পরিবহনে কোনো শৃঙ্খলা নেই। এবার নির্বাচনে এসব ছিল ভোটারদের মুখে মুখে।

উত্তর দিন

মন্তব্য করুন!

  Subscribe  
এর রিপোর্ট করুন